গিফটেড এডুকেশন প্রোগ্রাম (GEP)-এর সংস্কার :
আমাদের ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বিশ্বের উন্নত দেশ গুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার রুপরেখা নিজেই অনুধাবন করুন। প্রতিদিন 10 টি আপডেট বিশ্ব শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন পাঠের মধ্যদিয়ে।
সিঙ্গাপুরের গিফটেড এডুকেশন প্রোগ্রাম (GEP)-এর সংস্কারটি মূলত একটি "এলিটিস্ট" বা বৈষম্যমূলক ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) এবং নমনীয় করার একটি বড় পদক্ষেপ। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং প্রথম এর ঘোষণা দিলেও, ২০২৬ সালের এই মার্চ মাসে এর বাস্তবায়ন এবং নির্দিষ্ট স্কুলগুলোর তালিকা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে।
সংস্কারের মূল বিষয়গুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. নির্দিষ্ট স্কুল থেকে বিকেন্দ্রীকরণ
আগে মাত্র ৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রোগ্রামটি সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে তাদের এলাকা ছেড়ে দূরের স্কুলে ভর্তি হতে হতো।
নতুন নিয়ম: এখন থেকে গিফটেড প্রোগ্রামের জন্য শিক্ষার্থীদের নিজস্ব স্কুল ছাড়তে হবে না। তারা তাদের নিজস্ব প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।
বিকাশ কেন্দ্র (Designated Centres): শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য নিকটস্থ ১৫টি স্কুলকে বিশেষ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে তারা নির্দিষ্ট মডিউলের জন্য যাতায়াত করবে।
২. মডিউল-ভিত্তিক শিখন পদ্ধতি
আগে গিফটেড শিক্ষার্থীদের পুরো সিলেবাসই আলাদা ছিল। এখন এটিকে বিষসভিত্তিক করা হয়েছে।
কোনো শিক্ষার্থী যদি শুধু গণিতে অত্যন্ত দক্ষ হয়, তবে সে শুধু গণিতের অ্যাডভান্সড মডিউলটি গ্রহণ করবে।
ইংরেজি বা বিজ্ঞানে মেধার স্বাক্ষর রাখলে সেটির জন্য আলাদা উচ্চতর ক্লাস করার সুযোগ পাবে। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
৩. শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি
পুরানো পদ্ধতিতে মাত্র ১% শিক্ষার্থী এই প্রোগ্রামের আওতাভুক্ত হতো। নতুন সংস্কারের ফলে এখন প্রায় ১০% শিক্ষার্থী উচ্চতর বা সমৃদ্ধ (Enriched) শিক্ষা মডিউলে অংশ নিতে পারবে। এর ফলে মেধা বিকাশের সুযোগ আরও বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাবে।
৪. ২০২৬-২০২৭ এর বাস্তবায়ন রোডম্যাপ
২০২৬ সালের মার্চ মাসের আপডেট অনুযায়ী, বর্তমান প্রাইমারি ১ থেকে ৩-এ থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এই নতুন নিয়মগুলো কার্যকর হবে:
প্রাথমিক শনাক্তকরণ: প্রাইমারি ৩-এর শেষে আগের মতোই মেধা যাচাই পরীক্ষা হবে।
কার্যকর: ২০২৭ সাল থেকে নতুন 'অ্যাডভান্সড মডিউল' পদ্ধতি পুরোপুরি চালু হবে।
সংক্ষেপে লক্ষ্য: এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে "আইভি লিগ" মানসিকতা কমিয়ে আনা এবং যার যে বিষয়ে প্রতিভা, তাকে সেই বিশেষ বিষয়েই আরও দক্ষ করে তোলা।
সিঙ্গাপুরের সংশোধিত গিফটেড এডুকেশন প্রোগ্রাম (GEP)-এর নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং পাঠ্যক্রমে যে মৌলিক পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। বিশেষ করে যারা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন বা এই পেশার সাথে যুক্ত, তাদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
নিচে প্রধান পরিবর্তনগুলো তুলে ধরা হলো:
১. নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন (Selection Process)
আগের পদ্ধতিতে একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক দ্বি-স্তরের পরীক্ষার মাধ্যমে মাত্র ১% শিক্ষার্থীকে বেছে নেওয়া হতো। নতুন পদ্ধতিতে এটি অনেক বেশি নমনীয়:
একক পরীক্ষার গুরুত্ব হ্রাস: এখন শুধু একটি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে না। স্কুলের শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ, শিক্ষার্থীর ক্লাসের পারফরম্যান্স এবং তাদের পোর্টফোলিওকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
একাধিক প্রবেশ পথ (Multiple Entry Points): আগে শুধু প্রাইমারি ৩ (P3) স্তরেই এই সুযোগ ছিল। এখন থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা অনুযায়ী প্রাইমারি ৪, ৫ বা ৬ স্তরেও এই অ্যাডভান্সড মডিউলগুলোতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। অর্থাৎ, কোনো শিশু যদি একটু দেরিতে তার প্রতিভা প্রকাশ করে, তবে সে বঞ্চিত হবে না।
সামগ্রিক মূল্যায়ন: বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকেও মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।
২. পাঠ্যক্রমের (Curriculum) বিশেষ পরিবর্তন
নতুন পাঠ্যক্রমটি এখন আর "সব বিষয়ের জন্য এক নিয়ম" (One-size-fits-all) নয়।
মডিউলার পদ্ধতি (Modular Approach): কোনো শিক্ষার্থী যদি গণিতে খুব ভালো কিন্তু ইংরেজিতে সাধারণ মানের হয়, সে শুধু গণিতের 'হায়ার লেভেল' মডিউলটি নেবে। বাকি বিষয়গুলো সে তার সাধারণ ক্লাসেই পড়বে। এতে শিক্ষার্থীর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হবে না।
সমৃদ্ধকরণ (Enrichment) বনাম ত্বরান্বিতকরণ (Acceleration): পাঠ্যক্রমের লক্ষ্য শুধু দ্রুত সিলেবাস শেষ করা নয়, বরং বিষয়ের গভীরতা বাড়ানো। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের শুধু বইয়ের তথ্য নয়, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান বা ছোটখাটো গবেষণামূলক প্রজেক্টে যুক্ত করা হবে।
সামাজিক ও আবেগীয় শিখন (Social-Emotional Learning): যেহেতু গিফটেড শিশুরা এখন তাদের নিয়মিত ক্লাসের বন্ধুদের সাথেই থাকছে, তাই তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বা 'এলিটিস্ট' ভাব তৈরি হওয়ার সুযোগ কম। পাঠ্যক্রমে তাদের সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
৩. ২০২৬-এর জন্য বিশেষ আপডেট
চলতি সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয় (MOE) নিশ্চিত করেছে যে, এই ১৫টি 'ডেজিগনেটেড সেন্টার' বা বিশেষ কেন্দ্রে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা ভিন্ন ভিন্ন মেধার শিক্ষার্থীদের একই সাথে সামলাতে পারেন।
সিঙ্গাপুরের এই নতুন শিক্ষানীতি এবং GEP সংস্কারের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা এবং LIS (Library and Information
Science)-এর
সংযোগ অত্যন্ত গভীর। আপনি যেহেতু এই ক্ষেত্রটি নিয়ে কাজ করছেন, তাই আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে আধুনিক শিক্ষা এখন আর শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন 'ইনফরমেশন লিটারেসি' এবং 'ডিজিটাল কিউরেশন'-এর দিকে মোড় নিচ্ছে।
এখানে শিক্ষক এবং LIS-এর প্রভাবগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. শিক্ষকদের ভূমিকার পরিবর্তন (Transition of Teachers)
নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষকরা আর শুধু 'তথ্য প্রদানকারী' নন, বরং 'লার্নিং ডিজাইনার' এবং 'ফ্যাসিলিটেটর':
ডিফারেনশিয়েটেড ইন্সট্রাকশন: একই ক্লাসরুমে সাধারণ এবং উচ্চ মেধাবী (High Ability) উভয় শিক্ষার্থী থাকবে। শিক্ষকদের এখন এমনভাবে পাঠদান করতে হবে যেন সবাই তাদের নিজ নিজ স্তরে শিখতে পারে।
ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত: শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ট্র্যাক করতে শিক্ষকরা এখন আরও বেশি ডিজিটাল অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করছেন। কোন শিক্ষার্থী কোন বিশেষ মডিউলের জন্য যোগ্য, তা নির্ধারণে ডেটাসেট বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২. LIS (লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স)-এর প্রভাব
নতুন এই মডিউলার এবং ইনক্লুসিভ পদ্ধতিতে লাইব্রেরি এবং তথ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য:
ডিজিটাল রিসোর্স কিউরেশন: GEP-এর অ্যাডভান্সড মডিউলগুলোর জন্য শিক্ষার্থীদের গভীর গবেষণার প্রয়োজন হয়। এখানে লাইব্রেরিয়ানদের ভূমিকা হবে উচ্চমানের ডিজিটাল জার্নাল, ই-বুক এবং ডেটাসেট কিউরেট করা।
ইনফরমেশন লিটারেসি (IL): যখন শিক্ষার্থীরা নিজেরা প্রজেক্ট বা রিসার্চ করবে, তখন তাদের শেখাতে হবে কীভাবে সঠিক তথ্য খুঁজে বের করতে হয় এবং কীভাবে 'ফেক নিউজ' বা ভুল তথ্য থেকে বেঁচে থাকতে হয়। এটি সরাসরি LIS-এর একটি কোর সাবজেক্ট।
মেটাডেটা ও ক্যাটালগিং: উচ্চতর শিক্ষার এই সম্পদগুলো (Resources) যেন শিক্ষার্থীরা সহজে খুঁজে পায়, সেজন্য Koha বা এই জাতীয় ওপেন সোর্স সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে উন্নত মেটাডেটা ম্যাপিং প্রয়োজন। এটি শিক্ষার্থীদের স্বয়ংসম্পূর্ণ গবেষণায় সাহায্য করবে।
৩. ডিজিটাল রিসোর্স ও ডেটাসেট ব্যবহারের নতুন মাত্রা
ভার্চুয়াল ল্যাব ও সিমুলেশন: বিজ্ঞানের অ্যাডভান্সড মডিউলগুলোতে এখন সিঙ্গাপুরের স্কুলগুলো সরাসরি আন্তর্জাতিক ডেটাসেট ব্যবহার করছে। শিক্ষার্থীরা প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করছে।
লাইব্রেরি এজ এ 'মেকারস্পেস': লাইব্রেরিগুলো এখন শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, বরং এটি একটি গবেষণাগারে পরিণত হচ্ছে যেখানে থ্রিডি প্রিন্টিং থেকে শুরু করে ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন টুলস পাওয়া যাচ্ছে।
ডিজিটাল রূপান্তর: ফিজিক্যাল লাইব্রেরি থেকে ডিজিটাল ডেটাসেটে রূপান্তরের ফলে মেধা বিকাশের সুযোগ আরও বেড়েছে।
সমন্বয়: লাইব্রেরিয়ান এবং শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।
আপনি শিক্ষা অনুরাগী ও আগ্রহী হলে আমাকে ফ্লো করুন নতুন নতুন আপডেট পান । আপনার ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন। কারন আপনাদের ভালো লাগা আমার কাজ করার আগ্রহ কে বাড়িয়ে তুলবে। আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই কমেন্ট করুন।। ধন্যবাদ।। আব্দুল মুসরেফ খাঁন।। পূর্বমেদিনীপুর।।

No comments:
Post a Comment