পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাঁতন থানার অন্তর্গত মোগলমারি গ্রামটি বর্তমানে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র। এই স্থানটির ইতিহাসকে প্রধানত দুটি ধারায় ভাগ করা যায়: একটি এর প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য, আর অন্যটি মধ্যযুগীয় নামকরণ ও জনশ্রুতি।
নীচে মোগলমারির ইতিহাসের প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. বৌদ্ধ বিহার ও প্রাচীন ইতিহাস (৬ষ্ঠ – ১২শ শতাব্দী)
২০০৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অশোক দত্তের নেতৃত্বে শুরু হওয়া খননকার্যের ফলে মোগলমারির প্রকৃত প্রাচীন ইতিহাস সামনে আসে।
* বৌদ্ধ মহাবিহার: এখানে ৬ষ্ঠ থেকে ১২শ শতাব্দীর একটি বিশাল বৌদ্ধ বিহার বা মঠ আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম বৌদ্ধ মঠ কমপ্লেক্সগুলোর মধ্যে একটি।
* নামকরণ ও সীলমোহর: প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া সীলমোহর থেকে জানা যায়, এখানে 'যজ্ঞপিণ্ডিকা মহাবিহার' এবং 'মুগলায়িকাবিহারিকা' নামে দুটি মঠ ছিল। মনে করা হয়, 'মুগলায়িকাবিহারিকা' থেকেই আধুনিক 'মোগলমারি' নামের উৎপত্তি হতে পারে।
* স্থাপত্য শৈলী: বিহারের দেওয়ালগুলো চমৎকার 'স্টাকো' (চুন ও বালির পলেস্তারা) কাজ এবং নকশাদার ইট দিয়ে তৈরি। নালন্দা মহাবিহারের সাথে এর স্থাপত্যের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এখানে ভগবান বুদ্ধ ছাড়াও জম্ভল এবং সরস্বতী দেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করে যে এটি বৌদ্ধধর্মের বজ্রযান শাখার কেন্দ্র ছিল।
* হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণ: চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তাঁর ভারত ভ্রমণে তাম্রলিপ্ত অঞ্চলে যে দশটি মঠের উল্লেখ করেছিলেন, ঐতিহাসিকদের মতে মোগলমারি ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম।
২. নামকরণ ও মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপট
'মোগলমারি' নামটি নিয়ে একাধিক লোককথা ও ঐতিহাসিক সম্ভাবনা রয়েছে:
* তুকারই-এর যুদ্ধ (১৫৭৫): একটি জোরালো মতানুসারে, ১৫৭৫ সালে মুঘল সেনাপতি রাজা টোডরমল এবং বাংলার সুলতান দাউদ খান কররানির মধ্যে দাঁতনের তুকারই অঞ্চলে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল। এই যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর প্রচুর সৈন্য মারা যাওয়ায় স্থানটির নাম হয় 'মোগলমারি' (অর্থাৎ মোগলদের মরণ বা মার খাওয়া)।
* অমরাবতী নগরী: স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই গ্রামের প্রাচীন নাম ছিল 'অমরাবতী' এবং এটি রাজা বিক্রমকেশরীর রাজ্য দণ্ডভুক্তির অংশ ছিল।
৩. শশিসেনার পাঠশালা (লোককাহিনী)
খননকার্যের আগে এখানকার প্রধান ঢিবিটি স্থানীয়ভাবে 'সখিসোনার ঢিবি' বা 'শশিসেনার পাঠশালা' নামে পরিচিত ছিল। লোককাহিনী অনুসারে, রাজা বিক্রমকেশরীর কন্যা শশিসেনা ও অহিমাণিকের প্রেমকাহিনীর স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানটি। তবে খননকার্যের পর এটি একটি বৌদ্ধ মঠ হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে।
৪. প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
এখানে খনন করে গুপ্ত-উত্তর যুগের মুদ্রা, সোনা ও রূপার অলঙ্কার, বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি এবং প্রচুর টেরাকোটার সিলমোহর পাওয়া গেছে। এই আবিষ্কার বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য উন্মোচন করেছে।
No comments:
Post a Comment