Latest News

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ': এই উপন্যাসের কিছু অংশ মুসলিম বিদ্বেষী কি না, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে

 



 বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ': এই উপন্যাসের কিছু অংশ মুসলিম বিদ্বেষী কি না, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' (১৮৮২) উপন্যাসে মুসলিম বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িকতার উপাদান রয়েছে কি না, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক এই বিতর্কের গভীরে যেতে হলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিউভয় দিক থেকেই আলোচনা করা প্রয়োজন

নিচে এই বিতর্কের প্রধান দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

. মুসলিম বিদ্বেষের সপক্ষে যুক্তি (বিতর্কিত দিকসমূহ)

যাঁরা এই উপন্যাসটিকে মুসলিম বিদ্বেষী মনে করেন, তাঁরা সাধারণত নিম্নলিখিত পয়েন্টগুলো উল্লেখ করেন:

ভাষাগত ব্যবহার: উপন্যাসের বিভিন্ন স্থানে যবন, নেড়ে বা ম্লেচ্ছর মতো অবমাননাকর শব্দের ব্যবহার দেখা যায়

সন্তান দলের লক্ষ্য: উপন্যাসে 'সন্তান দল' বা সন্ন্যাসীদের মূল লক্ষ্য ছিল 'যবন রাজত্ব' ধ্বংস করা অনেক সমালোচকের মতে, এখানে শত্রু হিসেবে ব্রিটিশদের চেয়ে মুসলিম শাসকদের বেশি আক্রমণাত্মকভাবে দেখানো হয়েছে

উগ্র উক্তি: উপন্যাসের কিছু সংলাপে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক পাঠকদের কাছে সাম্প্রদায়িক মনে হতে পারে

. আত্মপক্ষ সমর্থন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

অন্যদিকে, অনেক সাহিত্য সমালোচক এবং ইতিহাসবিদ মনে করেন বঙ্কিমচন্দ্র ব্যক্তিগতভাবে মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন না তাঁদের যুক্তিগুলো হলো:

ঐতিহাসিক বাস্তবতা: ১৭৭০ সালের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে এটি রচিত সেই সময় বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বিশৃঙ্খল বঙ্কিমচন্দ্র তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু নবাবী শাসনের অরাজকতাকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন

রূপক বা অ্যালেগরি: অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ব্রিটিশ সেন্সরশিপ থেকে বাঁচতে বঙ্কিমচন্দ্র সরাসরি ব্রিটিশদের আক্রমণ না করে মুসলিম শাসকদের 'শত্রু' হিসেবে দেখিয়েছেন আসলে তাঁর লক্ষ্য ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানো

উপন্যাসের উপসংহার: উপন্যাসের শেষে 'চিকিৎসক' চরিত্রের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র বলিয়েছেন যে, ইংরেজরা শত্রু নয়, বরং তাদের আগমনে জ্ঞানের প্রসার ঘটবে অর্থাৎ তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অরাজকতা দূর করা, কোনো বিশেষ ধর্মের বিনাশ নয়


. রাজনৈতিক প্রভাব 'বন্দে মাতরম'

এই বিতর্কের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে 'বন্দে মাতরম' গানটি আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত এই গানটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবীদের প্রধান মন্ত্র ছিল তবে গানটিতে দেশমাতৃকাকে দুর্গা বা লক্ষ্মীর সাথে তুলনা করায় এবং উপন্যাসের প্রেক্ষাপটের কারণে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে একসময় এর বিরোধিতা করা হয়েছিল

'আনন্দমঠ' উপন্যাসের প্রেক্ষাপট হিসেবে 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' (১১৭৬ বঙ্গাব্দ বা ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই চরম দুর্ভিক্ষ এবং এর পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতাকে যেভাবে চিত্রায়িত করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য দলিল

নিচে এই প্রেক্ষাপট এবং এর সাথে যুক্ত কিছু নির্দিষ্ট চরিত্র দিক আলোচনা করা হলো:


. ছিয়াত্তরের মন্বন্তর: উপন্যাসের পটভূমি

উপন্যাসের সূচনাতেই আমরা দেখি এক জনশূন্য, হাহাকারময় পদচিহ্ন গ্রাম বঙ্কিমচন্দ্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনার সংমিশ্রণকে এই দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন

দ্বৈত শাসন শোষণ: ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর বাংলায় 'দ্বৈত শাসন' শুরু হয় একদিকে নবাবের ক্ষমতাহীন শাসন, অন্যদিকে ইংরেজদের সীমাহীন কর আদায়ের ক্ষুধাএই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ না খেতে পেয়ে মরতে শুরু করে

মানবিক বিপর্যয়: উপন্যাসে মহেন্দ্র কল্যাণীর ঘর ছাড়ার দৃশ্যটি সেই সময়ের চরম অসহায়ত্বের প্রতীক মা-বাবা নিজের সন্তানকে ফেলে পালাচ্ছে বা খাদ্যের অভাবে মানুষ মৃতদেহ ভক্ষণ করছেএমন ভয়াবহ চিত্র বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত নিপুণভাবে এঁকেছেন

. প্রধান চরিত্রসমূহের ভূমিকা রূপক

এই প্রেক্ষাপটে উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলো বিভিন্ন আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে:

মহেন্দ্র সিংহ কল্যাণী: এরা সাধারণ গৃহী মানুষের প্রতিনিধি, যারা দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারায় তাদের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকেই দেশপ্রেমের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়

সত্যানন্দ: তিনি 'সন্তান দল'-এর প্রতিষ্ঠাতা গুরু তাঁর চরিত্রটি আধ্যাত্মিকতা এবং চরম জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে, দেশমাতৃকার সেবা করতে হলে সমস্ত মায়া ত্যাগ করতে হবে

ভবানন্দ জীবানন্দ: এঁরা সত্যানন্দের যোগ্য শিষ্য তাঁদের চরিত্রে দেশপ্রেমের পাশাপাশি মানবিক দুর্বলতা ত্যাগের এক দ্বন্দ্ব দেখা যায় বিশেষ করে ভবানন্দ কল্যাণীর মধ্যকার সূক্ষ্ম আবেগীয় টানাপোড়েন উপন্যাসের কাহিনীতে নতুন মাত্রা যোগ করে

শান্তি: বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী নারী চরিত্র তিনি ছদ্মবেশে সন্তান দলে যোগ দেন এবং স্বামীর (জীবানন্দ) পাশে থেকে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন শান্তির চরিত্রটি প্রমাণ করে যে, দেশোদ্ধারের কাজে নারীদের ভূমিকা কোনো অংশেই কম নয়

. ঐতিহাসিক সত্যতা বনাম সাহিত্যিক কল্পনা

বঙ্কিমচন্দ্র মূলত ১৭৭৩ সালের সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহকে ভিত্তি করে উপন্যাসটি লিখেছিলেন, কিন্তু তিনি এর সময়কাল কিছুটা এগিয়ে এনে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সাথে মিলিয়ে দেন এটি করার কারণ ছিল সম্ভবত দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ব্রিটিশ বা তৎকালীন অপশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করা


. 'বন্দে মাতরম' দেশমাতা

মন্বন্তরের এই অন্ধকার প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় বিখ্যাত গান 'বন্দে মাতরম' এখানে দেশমাতৃকাকে তিনটি রূপে কল্পনা করা হয়েছে:

যা ছিলেন: সমৃদ্ধ ঐশ্বর্যময়ী (অতীত)

যা হয়েছেন: দুর্ভিক্ষপীড়িত, নগ্নিকা কঙ্কালসার (বর্তমান মন্বন্তর)

যা হবেন: দশপ্রহরণধারিণী দুর্গার মতো শক্তিশালী (ভবিষ্যৎ)

বঙ্কিমচন্দ্র 'আনন্দমঠ' রচনার সময় ইতিহাসকে হুবহু অনুসরণ না করে তাকে নিজের সাহিত্যিক আদর্শগত প্রয়োজনে কিছুটা পরিবর্তন করেছিলেন এই উপন্যাসে ঐতিহাসিক তথ্য বনাম সাহিত্যিক কল্পনা নিয়ে আলোচনা করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে

নিচে এই বিদ্রোহের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বঙ্কিমচন্দ্রের প্রয়োগ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হলো:


. ঐতিহাসিক সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০)

প্রকৃত ইতিহাসে এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণের বিরুদ্ধে হিন্দু সন্ন্যাসী এবং মুসলিম ফকিরদের একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ

নেতৃত্ব: বিদ্রোহের মূলে ছিলেন ভবানী পাঠক, মজনু শাহ, দেবী চৌধুরানী এবং মুসা শাহ- মতো ব্যক্তিরা

চরিত্র: এটি ছিল মূলত যাযাবর যোদ্ধা কৃষকদের বিদ্রোহ তীর্থযাত্রার ওপর কর আরোপ এবং কোম্পানির ভূমি রাজস্ব নীতির প্রতিবাদে তাঁরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন

. বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক তথ্যের রূপান্তর

বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসে ইতিহাসের কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন, যা আজও আলোচনার বিষয়:

মুসলিম ফকিরদের অনুপস্থিতি: ইতিহাসে সন্ন্যাসী ফকিররা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করলেও, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে ফকিরদের ভূমিকা প্রায় পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন তিনি একে একটি বিশুদ্ধ 'সন্তান দল' বা হিন্দু সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ হিসেবে দেখিয়েছেন

সময়ের পরিবর্তন: সন্ন্যাসী বিদ্রোহ দীর্ঘ সময় ধরে চললেও বঙ্কিমচন্দ্র একে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের (১৭৭০) ভয়াবহ প্রেক্ষাপটের সাথে জুড়ে দেন এর ফলে দুর্ভিক্ষের হাহাকার অরাজকতা বিদ্রোহের কারণ হিসেবে আরও জোরালো হয়ে ওঠে

বিদ্রোহের লক্ষ্য: প্রকৃত বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে কিন্তু উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র একে একটি 'ধর্মরাজ্য' বা হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যেখানে তৎকালীন নবাবী শাসনের অবসানকেও লক্ষ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে


. দেবী চৌধুরানী ভবানী পাঠক

'আনন্দমঠ'-এর সাথে বঙ্কিমচন্দ্রের অন্য একটি বিখ্যাত উপন্যাস 'দেবী চৌধুরানী'- গভীর সংযোগ আছে

'আনন্দমঠ'- সন্ন্যাসী বিদ্রোহের যে আদর্শিক আধ্যাত্মিক রূপ আমরা দেখি, 'দেবী চৌধুরানী' উপন্যাসে তারই ঐতিহাসিক বাস্তব রূপ প্রতিফলিত হয়েছে

ভবানী পাঠক চরিত্রটি ইতিহাসে একজন দুর্ধর্ষ বিদ্রোহী নেতা ছিলেন, যাকে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে এক আধ্যাত্মিক গুরু দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন

. কেন এই পরিবর্তন? (সাহিত্যিক রাজনৈতিক কারণ)

অনেকে মনে করেন, বঙ্কিমচন্দ্র সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের কথা লিখলে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করতে পারত তাই তিনি কৌশলে তৎকালীন মুসলিম শাসকদের অযোগ্যতাকে সামনে এনেছিলেন এবং ব্রিটিশদের শাসনের সূচনালগ্নকে এক প্রকার 'প্রয়োজনীয় পরিবর্তন' হিসেবে দেখিয়েছেন তবে তাঁর অন্তরের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করা


. শান্তির চরিত্র নারীশক্তির জাগরণ

বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে শান্তি চরিত্রটি বঙ্কিমচন্দ্রের এক অনন্য সৃষ্টি সেই রক্ষণশীল সময়েও তিনি একজন নারীকে রণক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে এবং রণকৌশলে পারদর্শী হিসেবে দেখিয়েছেন, যা ঐতিহাসিক বিদ্রোহে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতীকী রূপ হতে পারে

উপসংহার

বর্তমান সময়ের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে বলা হয় যে, বঙ্কিমচন্দ্র মূলত একজন রোমান্টিক জাতীয়তাবাদী ঔপন্যাসিক ছিলেন তাঁর লেখায় দেশপ্রেমের যে তীব্রতা ছিল, তা প্রকাশের জন্য তিনি যে ঐতিহাসিক পটভূমি বেছে নিয়েছিলেন, তাতে ধর্মীয় অনুষঙ্গ চলে এসেছে তবে আধুনিক সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে তাঁর কিছু শব্দচয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরাধীন জাতিকে জাগিয়ে তোলা

 


No comments:

Featured Post

কম্পিউটার সিস্টেম সেটআপ : আলোচনা

কম্পিউটার সিস্টেম ছবিটি একটি আধুনিক কম্পিউটার সিস্টেমের বিভিন্ন অংশ (Parts of a Computer System) নিয়ে একটি চমৎকার তথ্যচিত্র। একট...

Writer Profile

Writer Profile
Click Logo