মহাভারতের কর্ণপর্ব
মহাভারতের কর্ণপর্ব হলো কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগঘন অংশ। দ্রোণাচার্যের পতনের পর কর্ণ কৌরব বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হন। এই পর্বের মূল কাহিনীগুলো নিচে তালিকার আকারে দেওয়া হলো:
১. কর্ণের সেনাপত্য গ্রহণ
দ্রোণাচার্যের মৃত্যুর পর দুর্যোধন কর্ণকে সেনাপতি হিসেবে অভিষিক্ত করেন। কর্ণ মাত্র দুই দিন (যুদ্ধের ১৭শ ও ১৮শ দিন) সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন।
২. শল্যকে সারথি হিসেবে লাভ
কর্ণ অর্জুনের সাথে যুদ্ধের জন্য মদ্ররাজ শল্যকে তাঁর সারথি হিসেবে চান। শল্য অনিচ্ছুক থাকলেও দুর্যোধনের অনুরোধে রাজি হন, কিন্তু তিনি সারাক্ষণ অর্জুনের প্রশংসা করে কর্ণের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করেন।
৩. ভীম ও দুঃশাসনের যুদ্ধ
এই পর্বেই ভীম দুঃশাসনকে পরাজিত করেন এবং নিজের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী দুঃশাসনের বুক চিরে রক্ত পান করেন। দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিশোধ নিতে এটি ছিল এক ভয়াবহ দৃশ্য।
৪. কর্ণ ও যুধিষ্ঠিরের যুদ্ধ
কর্ণ যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেন এবং চরম অপমান করেন। কুন্তীকে দেওয়া কথা অনুযায়ী তিনি যুধিষ্ঠিরকে হত্যা করেননি, তবে তাঁর লাঞ্ছনায় যুধিষ্ঠির মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
৫. কর্ণ ও অর্জুনের চূড়ান্ত যুদ্ধ
যুদ্ধের ১৭তম দিনে কর্ণ ও অর্জুন মুখোমুখি হন। এটি ছিল মহাভারতের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দ্বৈরথ। কর্ণ তাঁর সমস্ত দিব্যাস্ত্র ব্যবহার করেন, কিন্তু কৃষ্ণের কৌশলে অর্জুন বারবার রক্ষা পান।
৬. কর্ণের রথের চাকা বসে যাওয়া
যুদ্ধের এক সংকটময় মুহূর্তে কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যায়। এটি ছিল পরশুরামের অভিশাপের ফল। কর্ণ অস্ত্র চালনার মন্ত্র ভুলে যেতে থাকেন।
৭. কর্ণের মৃত্যু
রথের চাকা তোলার জন্য কর্ণ যখন নিরস্ত্র অবস্থায় মাটিতে নামেন, তখন কৃষ্ণের নির্দেশে অর্জুন 'অঞ্জলিকা' অস্ত্র নিক্ষেপ করেন। নিরস্ত্র অবস্থায় কর্ণের এই মৃত্যু ছিল অত্যন্ত ট্র্যাজিক এবং এটি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
একটি বিশেষ তথ্য: কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর বীরত্বের কথা স্মরণ করে পাণ্ডবরাও শোকাহত হয়েছিলেন, বিশেষ করে যখন তাঁরা জানতে পারেন কর্ণ তাঁদেরই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন।
কর্ণের বীরত্ব এবং তাঁর পতনের নেপথ্যে থাকা অভিশাপগুলো মহাভারতের সবচেয়ে করুণ কাহিনীগুলোর মধ্যে একটি। কর্ণ কেন অজেয় হওয়া সত্ত্বেও অর্জুনের হাতে পরাজিত হলেন, তার পেছনে তিনটি মূল অভিশাপ কাজ করেছিল:
১. পরশুরামের অভিশাপ (অস্ত্র ভোলার অভিশাপ)
কর্ণ ব্রাহ্মণ সেজে পরশুরামের কাছে অস্ত্রশিক্ষা নিয়েছিলেন। একদিন পরশুরাম কর্ণের কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন, তখন একটি রক্তচোষা পোকা কর্ণের উরু ছিদ্র করে দিলেও তিনি গুরুর ঘুম ভাঙাননি। পরশুরাম জেগে উঠে কর্ণের সহনশীলতা দেখে বুঝতে পারেন যে তিনি ব্রাহ্মণ নন, কারণ একমাত্র ক্ষত্রিয়রাই এত কষ্ট সহ্য করতে পারে। মিথ্যা বলার অপরাধে পরশুরাম অভিশাপ দেন:
"যখন তোমার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে, তখন তুমি তোমার ব্রহ্মাস্ত্র চালানোর মন্ত্র ভুলে যাবে।"
২. ব্রাহ্মণের অভিশাপ (রথের চাকা বসে যাওয়া)
অসাবধানতাবশত কর্ণের তীরের আঘাতে এক ব্রাহ্মণের গাভী মারা যায়। শোকাতুর ব্রাহ্মণ কর্ণকে অভিশাপ দেন:
"যুদ্ধের ময়দানে যখন তুমি তোমার চরম শত্রুর মুখোমুখি হবে, তখন তোমার রথের চাকা মাটিতে বসে যাবে এবং তুমি অসহায় হয়ে পড়বে।"
৩. ধরিত্রী মাতার অভিশাপ
একবার এক ছোট মেয়ে ঘি হারিয়ে কাঁদছিল। কর্ণ তাকে সাহায্য করতে মাটি থেকে ঘিয়ে ভেজা কাদা তুলে নিংড়ে ঘি বের করে দেন। এতে ধরিত্রী মাতা ব্যথিত হন এবং বলেন:
"তুমি যেভাবে আমার দেহকে নিংড়ে কষ্ট দিলে, যুদ্ধের কঠিন সময়ে আমিও তোমার রথের চাকাকে একইভাবে গ্রাস করব।"
কর্ণের শেষ যুদ্ধ: ১৭তম দিনের লড়াই
অর্জুন এবং কর্ণের এই যুদ্ধ ছিল সমানে সমান। কিন্তু একে একে এই অভিশাপগুলো ফলতে শুরু করে:
- কর্ণের রথের চাকা কাদায় বসে যায়।
- তিনি চাকা তোলার সময় পরশুরামের দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্রের মন্ত্র ভুলে যান।
- শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মনে করিয়ে দেন যে, কর্ণ অধর্মের পক্ষে লড়ছেন, তাই এই মুহূর্তে তাঁকে আঘাত করা অন্যায় হবে না।
শেষ পর্যন্ত অর্জুনের 'অঞ্জলিকা' অস্ত্রের আঘাতে কর্ণের মস্তক বিচ্ছিন্ন হয় এবং তাঁর তেজ সূর্যের সাথে মিশে যায়।
কর্ণ ও কৃষ্ণের সেই শেষ মুহূর্তের কথোপকথন মহাভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং আবেগঘন দৃশ্য। যুদ্ধের ময়দানে যখন কর্ণ রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মহিমা পরীক্ষা করতে ছদ্মবেশে সেখানে উপস্থিত হন।
এই শেষ কথোপকথনের মূল অংশগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. দানবীর কর্ণের শেষ পরীক্ষা
কর্ণ যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ একজন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে তাঁর কাছে এসে দান ভিক্ষা করেন। কর্ণ অসহায়ভাবে বলেন যে, তাঁর কাছে এখন দেওয়ার মতো কিছুই নেই। তখন ব্রাহ্মণ (কৃষ্ণ) তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে, কর্ণের দাঁতে সোনা বাঁধানো আছে।
২. অদম্য ত্যাগ
কর্ণ একটুও দ্বিধা না করে একটি পাথর দিয়ে নিজের দাঁত ভেঙে ফেলেন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় সেই সোনা ব্রাহ্মণকে দান করেন। কর্ণের এই অসীম ত্যাগ দেখে শ্রীকৃষ্ণ মুগ্ধ হন এবং নিজের আসল রূপে আবির্ভূত হন।
৩. কর্ণের আক্ষেপ ও কৃষ্ণের সান্ত্বনা
কর্ণ জানতেন যে তিনি পাণ্ডবদের বড় ভাই, কিন্তু নিয়তির ফেরে তিনি কৌরবদের পক্ষে লড়েছেন। কৃষ্ণ তাঁকে বলেন:
"কর্ণ, তুমি অধর্মের পক্ষে ছিলে ঠিকই, কিন্তু তোমার বীরত্ব এবং দানশীলতা তোমাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রাখবে। তুমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দানবীর।"
৪. কর্ণের শেষ ইচ্ছা
শ্রীকৃষ্ণ
কর্ণকে বর দিতে চাইলে কর্ণ দুটি বিশেষ প্রার্থনা করেন:
·
তিনি চান যেন আগামী জন্মে তিনি নিচুজাত বা 'সূতপুত্র' হিসেবে অবহেলিত না হন।
·
তিনি চান যে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যেন এমন এক পবিত্র স্থানে হয় যেখানে আগে কখনও কোনো পাপ ঘটেনি। (বলা হয়, কৃষ্ণ তখন নিজের হাতের তালুতে কর্ণের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছিলেন)।
৫.
কৃষ্ণের স্বীকৃতি
কৃষ্ণ অর্জুনকেও বুঝিয়েছিলেন যে, কর্ণ যদি অভিশপ্ত না হতেন এবং তাঁর কবচ-কুণ্ডল থাকত, তবে দেবরাজ ইন্দ্রও তাঁকে পরাজিত করতে পারতেন না। কর্ণের মৃত্যুর পর কৃষ্ণ নিজেই বলেছিলেন যে, পৃথিবী আজ এক মহান বীর এবং পরম বন্ধুকে হারাল।
কর্ণের জন্মরহস্য এবং কুন্তীর সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ মহাভারতের প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত জটিল এবং করুণ অধ্যায়। নিচে এই কাহিনীর মূল অংশগুলো আলোচনা করা হলো:
১. কর্ণের জন্মরহস্য
মহারাজ
পাণ্ডুর সাথে বিয়ের আগে, কুন্তী যখন বালিকা ছিলেন, তখন ঋষি দুর্বাসা তাঁকে একটি বিশেষ মন্ত্র দান করেছিলেন। এই মন্ত্রের মাধ্যমে তিনি যে কোনো দেবতাকে আহ্বান করে সন্তান লাভ করতে পারতেন। কৌতূহলবশত কুন্তী সূর্যদেবকে আহ্বান করেন এবং তাঁর আশীর্বাদে কর্ণের জন্ম হয়।
·
কবচ ও
কুণ্ডল: সূর্যদেবের অংশ হওয়ায় কর্ণ জন্ম থেকেই অজেয় স্বর্ণালী কবচ ও কুণ্ডল নিয়ে জন্মেছিলেন।
·
পরিত্যাগ: লোকলজ্জার ভয়ে অবিবাহিত কুন্তী সদ্যোজাত শিশুকে একটি ঝুড়িতে ভরে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেন।
·
পরিচয়: অধিরথ নামক এক সূত (সারথি) এবং তাঁর স্ত্রী রাধা শিশুটিকে খুঁজে পান এবং নিজেদের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। এ কারণেই কর্ণকে 'সূতপুত্র' বা 'রাধেয়' বলা হয়।
২. কুন্তীর সাথে কর্ণের প্রথম সাক্ষাৎ (যুদ্ধের আগে)
যুদ্ধের
প্রাক্কালে যখন কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দেওয়ার জন্য কর্ণকে অনুরোধ করেন, তখন কর্ণ তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর কুন্তী স্বয়ং কর্ণের কাছে যান এবং তাঁর প্রকৃত পরিচয় ফাঁস করেন। সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগপ্রবণ:
·
মা-ছেলের কথোপকথন: গঙ্গার তীরে কর্ণ যখন প্রার্থনা করছিলেন, তখন কুন্তী তাঁকে বলেন যে তিনি সূতপুত্র নন, বরং তিনি পাণ্ডবদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তিনি কর্ণকে পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দিতে এবং রাজা হতে অনুরোধ করেন।
·
কর্ণের প্রত্যাখ্যান: কর্ণ কুন্তীকে মনে করিয়ে দেন যে, যখন তিনি অপমানিত হয়েছিলেন, তখন কুন্তী তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু দুর্যোধন তাঁকে সম্মান ও বন্ধুত্ব দিয়েছিলেন। তাই তিনি দুর্যোধনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবেন না।
·
দানবীর কর্ণের প্রতিশ্রুতি: কুন্তীকে খালি হাতে ফেরাতে না পেরে কর্ণ এক অভূতপূর্ব প্রতিশ্রুতি দেন:
"মা, যুদ্ধে তোমার পাঁচ পুত্রই জীবিত থাকবে। হয় অর্জুন মরবে, না হয় আমি। যদি আমি মরি, তবে তোমার বাকি চার পুত্র ও অর্জুন থাকবে। আর অর্জুন মরলে আমি তোমার পুত্র হিসেবে থাকব।"
কর্ণ কেবল কুন্তীকে কথা দিয়েছিলেন যে তিনি অর্জুন ছাড়া বাকি চার পাণ্ডবকে (যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল ও সহদেব) সুযোগ পেয়েও হত্যা করবেন না—এবং তিনি সেই কথা রেখেছিলেন।
@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

No comments:
Post a Comment