দ্রোণপর্ব ও অভিমন্যু বধের মূল কাহিনী
মহাভারতের দ্রোণপর্ব, যেখানে ভীষ্মের পতনের পর গুরু দ্রোণাচার্য কৌরবদের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আপনার অনুরোধ অনুযায়ী এই পর্বের মূল কাহিনীগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে দিয়েছি:
দ্রোণপর্ব ও
অভিমন্যু বধের কাহিনী:
·
দ্রোণাচার্যের সেনাপতিত্ব: ভীষ্মের শরশয্যার পর দ্রোণাচার্য কৌরব সেনার দায়িত্ব নেন এবং যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করার কৌশল সাজান।
·
অর্জুনকে দূরে সরানো: দ্রোণ জানতেন অর্জুন থাকলে চক্রব্যূহ ভেদ করা অসম্ভব, তাই সংশপ্তক বাহিনীর মাধ্যমে অর্জুনকে মূল রণক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
·
অজেয় চক্রব্যূহ: পাণ্ডবদের দমনে দ্রোণাচার্য অত্যন্ত জটিল 'চক্রব্যূহ' রচনা করেন।
·
অভিমন্যুর বীরত্ব: মাত্র ১৬ বছর বয়সী অভিমন্যু ব্যূহ ভেদের কৌশল জানতেন (কিন্তু বের হওয়ার নয়)। তিনি একাই সেই চক্রব্যূহে প্রবেশ করেন এবং বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন।
·
সপ্ত মহারথীর অন্যায় যুদ্ধ: যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে সাতজন মহারথী (দ্রোণ, কর্ণ, অশ্বত্থামা প্রমুখ) মিলে নিরস্ত্র ও একা অভিমন্যুকে ঘিরে ফেলেন।
·
মর্মান্তিক মৃত্যু: বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতে অবশেষে অভিমন্যু শাহাদাত বরণ করেন (বা মৃত্যুবরণ করেন)।
·
অর্জুনের প্রতিজ্ঞা: পুত্রের অকাল মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকাতুর অর্জুন পরের দিন সূর্যাস্তের আগে জয়দ্রথকে বধ করার কঠোর প্রতিজ্ঞা করেন।
দ্রোণাচার্যের সেনাপতিত্ব গ্রহণ ও পাণ্ডব দমনের প্রতিজ্ঞা
দ্রোণপর্বের সূচনায় ভীষ্মের পতনের পর কৌরব শিবিরের বিষণ্ণতা কাটাতে কর্ণ পরামর্শ দেন যে, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যই এখন সেনাপতিত্বের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি।
দুর্যোধনের অনুরোধে দ্রোণাচার্য কৌরবদের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পাণ্ডবদের দমনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিজ্ঞা ও কৌশল গ্রহণ করেছিলেন:
১. যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করার কৌশল
দ্রোণাচার্য জানতেন অর্জুনকে পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব। তাই তিনি দুর্যোধনকে কথা দেন যে, তিনি যুধিষ্ঠিরকে হত্যা না করে জীবিত বন্দী করবেন। তার পরিকল্পনা ছিল যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করে পুনরায় পাশা খেলায় বাধ্য করা এবং পাণ্ডবদের আবারও বনবাসে পাঠিয়ে যুদ্ধ সমাপ্ত করা।
২. অজেয় 'চক্রব্যূহ' রচনা
পাণ্ডব পক্ষকে কোণঠাসা করতে তিনি প্রাচীন সমরবিদ্যার অন্যতম কঠিন রণকৌশল 'চক্রব্যূহ' প্রয়োগের প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি জানতেন অর্জুন ও কৃষ্ণ ছাড়া পাণ্ডবদের আর কেউ এই ব্যূহ ভেদ করতে জানেন না।
৩. অর্জুনকে রণক্ষেত্র থেকে সরানো
দ্রোণাচার্য কৌশলগতভাবে অর্জুনকে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সংশপ্তক বাহিনীকে (ত্রিগর্তের রাজা সুশর্মার নেতৃত্বাধীন আত্মঘাতী দল) নিযুক্ত করেন। অর্জুন যখন তাদের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সুযোগেই দ্রোণ চক্রব্যূহ রচনা করে পাণ্ডবদের পর্যুদস্ত করার পরিকল্পনা করেন।
৪. পাণ্ডব দমনের অঙ্গীকার
গুরু দ্রোণ অর্জুনের প্রতি দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও কৌরবদের প্রতি তার আনুগত্য বজায় রেখেছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে প্রতিদিন অন্তত একজন পাণ্ডব বীর বা কয়েক হাজার পাণ্ডব সৈন্য তিনি বিনাশ করবেন। এই দ্রোণপর্বেই তার রণকৌশলের জালে পড়ে অভিমন্যুর মতো মহাবীরকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
সংশপ্তক বাহিনীর সাথে অর্জুনের যুদ্ধ ও অর্জুনকে রণক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া
দ্রোণাচার্যের সেনাপতিত্বের দ্বিতীয় দিনে সংশপ্তক বাহিনীর সাথে অর্জুনের এই যুদ্ধ ছিল এক সুপরিকল্পিত চাল। কৌরবদের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করা, আর তার পথে একমাত্র বাধা ছিলেন অর্জুন।
এই যুদ্ধের মূল বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সংশপ্তক বাহিনী কারা?
সংশপ্তক হলো সেইসব বীর যোদ্ধা যারা অগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছিল যে— হয় তারা অর্জুনকে বধ করবে, না হয় নিজেরা রণক্ষেত্রে প্রাণ দেবে। ত্রিগর্তের রাজা সুশর্মা এবং তার ভাইয়েরা এই আত্মঘাতী বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
২. রণকৌশল ও প্রলোভন
দ্রোণাচার্য জানতেন অর্জুন রণক্ষেত্রে উপস্থিত থাকলে যুধিষ্ঠিরকে স্পর্শ করাও অসম্ভব। তাই সুশর্মা অর্জুনকে যুদ্ধের জন্য বারবার আহ্বান (Challenge) জানাতে থাকেন এবং রণক্ষেত্রের দক্ষিণ দিকে নিয়ে যান। ক্ষত্রিয় ধর্মের কারণে অর্জুন সেই আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেননি।
৩. ভয়াবহ যুদ্ধ
অর্জুন যখন দক্ষিণ দিকে সরে যান, তখন সংশপ্তক বাহিনী তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। হাজার হাজার তীরের আঘাতে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণকে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলেছিল তারা। অর্জুন তখন 'ত্বাষ্ট্র' ও 'বায়ব্যাস্ত্র' প্রয়োগ করে এই বিশাল বাহিনীকে প্রতিহত করেন।
৪. অর্জুনের অনুপস্থিতির সুযোগ
অর্জুন যখন দূরে সংশপ্তকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, ঠিক সেই সুযোগেই দ্রোণাচার্য পাণ্ডবদের মূল বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অপরাজেয় 'চক্রব্যূহ' রচনা করেন। অর্জুনের অনুপস্থিতিতেই অভিমন্যুকে সেই ব্যূহে প্রবেশ করতে হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত এক ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়।
দ্রোণাচার্য কর্তৃক অজেয় 'চক্রব্যূহ' রচনা
দ্রোণাচার্যের সেনাপতিত্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং জটিল রণকৌশল ছিল এই 'চক্রব্যূহ' (যাকে 'পদ্মব্যূহ'ও বলা হয়)। অর্জুন যখন সংশপ্তক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে অনেক দূরে চলে যান, তখন পাণ্ডবদের অবরুদ্ধ করতে দ্রোণ এই অজেয় ব্যূহটি রচনা করেন।
চক্রব্যূহ
সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. ব্যূহের গঠন ও সজ্জা
এটি ছিল একটি ঘূর্ণায়মান গোলকধাঁধার মতো। এতে কয়েক স্তরে সৈন্য সাজানো থাকত এবং প্রতিটি স্তর প্রতিনিয়ত তার অবস্থান পরিবর্তন করত। ব্যূহের প্রবেশপথ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন ছিল কারণ প্রতিটি মোড়ে শক্তিশালী বীরেরা অবস্থান করতেন।
২. কেন এটি অজেয় ছিল?
·
চলমান দেয়াল: এই ব্যূহটি স্থির থাকত না; এটি চাকার মতো ঘুরত, যার ফলে শত্রুপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আঘাত হেনে স্থির হতে পারত না।
·
বিশেষ প্রশিক্ষণ: এই ব্যূহে প্রবেশ এবং তা থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসার কৌশল কেবল অর্জুন, শ্রীকৃষ্ণ, প্রদ্যুম্ন এবং অভিমন্যু জানতেন (তবে অভিমন্যু কেবল প্রবেশের কৌশল জানতেন)।
·
সপ্ত মহারথীর সুরক্ষা: ব্যূহের বিভিন্ন স্তরে কর্ণ, অশ্বত্থামা, শল্য, কৃপাচার্য, দুঃশাসন এবং স্বয়ং দ্রোণাচার্য অজেয় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
৩. যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করার লক্ষ্য
দ্রোণাচার্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই ব্যূহের মাধ্যমে পাণ্ডবদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া এবং যুধিষ্ঠিরকে জীবিত বন্দী করা। যখন যুধিষ্ঠির দেখলেন অর্জুন নেই এবং পাণ্ডব সেনার মনোবল ভেঙে পড়ছে, তখন তিনি ১৬ বছর বয়সী কিশোর অভিমন্যুকে এই ব্যূহ ভেদের অনুরোধ জানান।
৪. ব্যূহ ভেদের ট্র্যাজেডি
অভিমন্যু
তার অসীম সাহসে ব্যূহের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং প্রথম কয়েক স্তরের ব্যূহ তছনছ করে দেন। কিন্তু জয়দ্রথের বাধার কারণে অন্য পাণ্ডব বীরেরা অভিমন্যুর পেছনে ব্যূহে ঢুকতে ব্যর্থ হন। ফলে অভিমন্যু একা ব্যূহের ভেতরে আটকা পড়ে যান।
তরুণ অভিমন্যুর চক্রব্যূহে প্রবেশ ও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ
চক্রব্যূহের সেই ভয়াবহ দিনে ১৬ বছর বয়সী কিশোর অভিমন্যু যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তা মহাভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। অর্জুনের অনুপস্থিতিতে পাণ্ডবদের সম্মান রক্ষা করতে তিনি একাই মৃত্যুমুখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
এই যুদ্ধের প্রধান পর্যায়গুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. অসম সাহসী প্রবেশ
যখন যুধিষ্ঠির, ভীম ও অন্য বীরেরা চক্রব্যূহের সামনে দিশেহারা, তখন অভিমন্যু এগিয়ে আসেন। তিনি জানতেন কীভাবে ব্যূহ ভেদ করতে হয়, কিন্তু বের হওয়ার পথ তার জানা ছিল না। তবুও পিতার সম্মান রক্ষার্থে তিনি তাঁর সারথি সুমিত্রকে রথ চালানোর আদেশ দেন এবং মুহূর্তের মধ্যে দ্রোণাচার্যের অপরাজেয় ব্যূহ তছনছ করে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
২. জয়দ্রথের বাধা
অভিমন্যু ভেতরে প্রবেশের পর ভীম ও অন্য পাণ্ডবরাও তাঁর পেছন পেছন ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ, শিবের বরে সেই একদিনের জন্য অপরাজেয় হয়ে পাণ্ডবদের ব্যূহের প্রবেশমুখেই আটকে দেন। ফলে অভিমন্যু বিশাল কৌরব বাহিনীর মাঝখানে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন।
৩. অভিমন্যুর সংহার রূপ
একাকী অভিমন্যু ব্যূহের ভেতরে কালান্তক যমের মতো যুদ্ধ শুরু করেন। তাঁর তীরের আঘাতে কৌরব সেনা খড়কুটার মতো উড়তে থাকে। তিনি:
·
দুর্যোধনের পুত্র লক্ষণকে সবার সামনে বধ করেন।
·
কর্ণ, শল্য ও দুঃশাসনকে পরাজিত ও আহত করে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
·
দ্রোণাচার্য স্বয়ং তাঁর রণকৌশল দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, "এই বালকের বীরত্ব অর্জুনের চেয়েও ভয়ংকর।"
৪. বীরত্বের চরম শিখর
কৌরবদের শ্রেষ্ঠ বীরেরা যখন দেখলেন যে একক যুদ্ধে অভিমন্যুকে হারানো অসম্ভব, তখন তাঁরা রণনীতি ত্যাগ করার ষড়যন্ত্র করেন। চারদিক থেকে আসা হাজার হাজার তীরের আঘাতে তাঁর রথ ভেঙে যায়, ঘোড়া মারা পড়ে এবং ধনুক কেটে ফেলা হয়। নিরস্ত্র হয়েও অভিমন্যু হার মানেননি; তিনি রথের একটি চাকা তুলে নিয়ে তা দিয়েই শত্রুদের মোকাবিলা করতে থাকেন।
সপ্ত মহারথী (দ্রোণ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, শল্য, শকুনি ও দুঃশাসন) কর্তৃক অন্যায়ভাবে অভিমন্যুকে ঘিরে ফেলা
চক্রব্যূহের ভেতরে একাকী অভিমন্যুর পরাক্রম দেখে কৌরব শিবিরের শ্রেষ্ঠ বীরেরা যখন প্রমাদ গুনছিলেন, তখন শুরু হয় যুদ্ধের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। কর্ণ ও দ্রোণাচার্যের মতো মহারথীরা বুঝতে পারেন যে, ধর্মযুদ্ধে এই কিশোরকে হারানো সম্ভব নয়।
সপ্ত মহারথীর সেই অন্যায় যুদ্ধের বিবরণ:
১. রণনীতি লঙ্ঘন ও ষড়যন্ত্র
শকুনি ও কর্ণের পরামর্শে স্থির হয় যে, অভিমন্যুকে মারতে হলে অধর্মের আশ্রয় নিতে হবে। বীরের নিয়ম অনুযায়ী একজন যোদ্ধার সাথে কেবল একজনেরই যুদ্ধ করার কথা, কিন্তু অভিমন্যুকে ঘিরে ধরেন সপ্ত মহারথী (দ্রোণ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, শল্য, শকুনি এবং দুঃশাসন)।
২. পেছন থেকে আঘাত
কর্ণকে
নির্দেশ দেওয়া হয় অভিমন্যুর ধনুক কেটে ফেলার জন্য। অর্জুন-পুত্র যখন অন্য যোদ্ধাদের সাথে ব্যস্ত, তখন কর্ণ পেছন থেকে অতর্কিতে তাঁর ধনুকের ছিলা কেটে দেন। মুহূর্তের মধ্যে দ্রোণাচার্য ও অন্য বীরেরা তাঁর রথ এবং ঘোড়াগুলোকেও মেরে ফেলেন।
৩. নিরস্ত্র অবস্থায় আক্রমণ
ধনুক ভেঙে যাওয়ায় অভিমন্যু তলোয়ার হাতে তুলে নেন, কিন্তু শকুনি তাঁর তলোয়ারটিও ভেঙে ফেলেন। এরপর বীর অভিমন্যু রথের একটি চাকা
হাতে তুলে নিয়ে গদার মতো তা ঘুরিয়ে শত্রুসেনাদের মোকাবিলা করতে থাকেন। কিন্তু সপ্ত মহারথী একযোগে তাঁর ওপর অবিরাম অস্ত্র বর্ষণ করতে থাকেন।
৪. দুঃশাসনের পুত্রের চূড়ান্ত আঘাত
অভিমন্যু
যখন প্রায় মৃতপ্রায় ও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন, তখন দুঃশাসনের পুত্র তাঁর মাথায় গদা দিয়ে আঘাত করেন। অনাহারে, ক্লান্তিতে এবং ক্ষতবিক্ষত শরীরেও এই কিশোর বীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গিয়ে বীরগতি প্রাপ্ত হন।
নিশস্ত্র অভিমন্যুর মর্মান্তিক মৃত্যু
অভিমন্যুর মৃত্যু মহাভারতের যুদ্ধের অন্যতম শোকাবহ এবং কলঙ্কিত অধ্যায়। যখন বীর কিশোর অভিমন্যু সম্পূর্ণ নিঃশস্ত্র হয়ে পড়েছিলেন, তখন কৌরব পক্ষ যুদ্ধের সমস্ত নীতি বিসর্জন দিয়ে তাঁকে আক্রমণ করে।
এই মর্মান্তিক পরিণতির মূল পর্যায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. চাকা হাতে শেষ লড়াই
যখন অভিমন্যুর ধনুক কাটা পড়ল, রথ চূর্ণ হলো এবং তলোয়ার ভেঙে গেল, তখন তিনি দমে যাননি। তিনি ভূমিতে পড়ে থাকা রথের একটি চাকা তুলে নিয়ে গদার মতো ঘোরাতে থাকেন। সেই অবস্থায় তিনি দ্রোণ ও কর্ণের মতো বীরদেরও কিছুক্ষণ প্রতিহত করেছিলেন। কিন্তু মহাবীরেরা একযোগে সেই চাকাটিও টুকরো টুকরো করে ফেলেন।
২. নিরস্ত্র বীরের ওপর আক্রমণ
মহাভারতের নিয়ম অনুযায়ী, একজন সশস্ত্র যোদ্ধা কখনও নিরস্ত্র বা ভূপাতিত যোদ্ধাকে আঘাত করতে পারে না। কিন্তু সপ্ত মহারথী সেই নিয়ম ভেঙে চারদিক থেকে অভিমন্যুকে ঘিরে ফেলে অবিরাম বাণ বর্ষণ করতে থাকেন। অভিমন্যু তখন গদা হাতে নিয়ে দুঃশাসনের পুত্রের সাথে দ্বৈরথ যুদ্ধে লিপ্ত হন।
৩. দুঃশাসন-পুত্রের গদার আঘাত
মরণপণ যুদ্ধে অভিমন্যু এবং দুঃশাসনের পুত্র—উভয়েই গদার আঘাতে মাটিতে পড়ে যান। দুঃশাসনের পুত্র দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং অচেতন ও নিরস্ত্র অভিমন্যুর মাথায় সজোরে গদা দিয়ে আঘাত করেন। এই প্রাণঘাতী আঘাতেই মহাবীর অভিমন্যু বীরগতি প্রাপ্ত হন।
৪. কৌরবদের অট্টহাসি ও পাণ্ডবদের হাহাকার
এক বালকের মৃত্যুতে কৌরব শিবিরে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়, যা ছিল বীরত্বের পরিপন্থী। জয়দ্রথ অভিমন্যুর মৃতদেহকে অপমান করেন, যা পাণ্ডবদের ক্ষোভকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সায়াহ্নে যখন অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসেন, তখন সমগ্র পাণ্ডব শিবির নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।
পুত্রের মৃত্যুর সংবাদে অর্জুনের শোক ও জয়দ্রথ বধের কঠোর প্রতিজ্ঞা
সংশপ্তক বাহিনীকে পরাজিত করে সূর্যাস্তের পর যখন অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ শিবিরে ফিরে আসেন, তখন চারদিকের অস্বাভাবিক নীরবতা দেখে অর্জুন অমঙ্গল আশঙ্কা করেন। এরপর যুধিষ্ঠিরের মুখে অভিমন্যুর বীরত্ব ও সপ্ত মহারথীর অন্যায়ের কথা শুনে অর্জুন শোকে ভেঙে পড়েন।
এই শোক এবং এরপরের সেই বিখ্যাত প্রতিজ্ঞার কাহিনী নিচে দেওয়া হলো:
১. অর্জুনের শোক ও বিলাপ
পুত্রের শোচনীয় মৃত্যুর কথা শুনে অর্জুন জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান। চেতনা ফিরে পাওয়ার পর তিনি বিলাপ করতে থাকেন যে, একাকী বালককে রক্ষা করার জন্য কোনো পাণ্ডব বীর এগিয়ে যেতে পারলেন না। তিনি শ্রীকৃষ্ণের সামনে দাঁড়িয়ে আক্ষেপ করেন যে, যাঁর পিতা অর্জুন এবং মামা কৃষ্ণ, তাঁর মৃত্যু এমন অসহায়ভাবে হলো!
২. জয়দ্রথের অপরাধ ও ক্রোধ
অর্জুন জানতে পারেন যে, অভিমন্যুকে বাঁচাতে ভীম ও যুধিষ্ঠির ব্যূহে ঢুকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ মহাদেবের বরে তাঁদের সবাইকে একা আটকে রেখেছিলেন। জয়দ্রথই ছিলেন অভিমন্যুর একাকী হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। এই সংবাদ শোনার পর অর্জুনের শোক অসীম ক্রোধে পরিণত হয়।
৩. সেই ঐতিহাসিক কঠোর প্রতিজ্ঞা
অর্জুন গাণ্ডীব ধনুক হাতে নিয়ে জল স্পর্শ করে সকলের সামনে প্রতিজ্ঞা করেন:
"আগামীকাল সূর্যাস্তের আগে যদি আমি জয়দ্রথকে বধ করতে না পারি, তবে আমি নিজেই জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশ করে আত্মাহুতি দেব।"
৪. কৌরব শিবিরে আতঙ্ক
অর্জুনের এই প্রতিজ্ঞার কথা শুনে কৌরব শিবিরে হাহাকার পড়ে যায়। দ্রোণাচার্য বুঝতে পারেন যে অর্জুন এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে না পারলে পাণ্ডবদের শক্তি অর্ধেক হয়ে যাবে। তাই জয়দ্রথকে বাঁচাতে পরদিন দ্রোণাচার্য তিনটি স্তরের বিশাল ব্যূহ (শকট, পদ্ম ও সূচী ব্যূহ) রচনা করেন এবং জয়দ্রথকে ব্যূহের একেবারে শেষ প্রান্তে লুকিয়ে রাখা হয়।
@আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

No comments:
Post a Comment