বিবাহবিচ্ছেদ সম্পর্কে কোরআনের বানী
আসসালামুয়ালাইকুম মোমেনগন 🙋♂️🙋♂️🙋♂️ পবিত্র অল্ কোরাআন কেবল মাত্র ধর্ম গ্রন্থ নয়। বিশ্ব মানব কল্যাণে উৎকৃষ্ট আধ্যাত্মিক পরিপুরক গ্রন্থ। পবিত্র “রমজান মাসে অল্ কোরআনের সাথে” অর্থ না বুঝে কেবল মাত্র আরবি উচ্চারণ আর নয় চলুন আরবি উচ্চারণের পাশাপাশি বাংলা অর্থ বুঝার ও আমল করার চেষ্টা করি :
ইসলামে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে মূলত ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সমঝোতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নিচে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত কুরআনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত আরবি ও বাংলা অর্থসহ দেওয়া হলো:
১. সমঝোতার গুরুত্ব (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৫)
বিবাহবিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারকে মধ্যস্থতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
অর্থ: "আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তবে বরের পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী এবং কনের পরিবার থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত করো। যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিমাংসা করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।"
২. তালাকের নিয়ম ও সদাচরণ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৯)
বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও যেন নারী বা পুরুষ কারো ওপর জুলুম না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে:
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
অর্থ: "তালাক দু’বার (প্রদান করা যায়); এরপর হয় বিধি মোতাবেক রেখে দেবে, না হয় সদ্ভাবের সাথে (এহসানের সাথে) মুক্ত করে দেবে।"
৩. ইদ্দত পালন ও থাকার অধিকার (সূরা আত-তালাক, আয়াত: ১)
তালাক দেওয়ার পদ্ধতি এবং পরবর্তী আবশ্যিক ধাপ সম্পর্কে বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ ۖ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ
অর্থ: "হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে তালাক দাও এবং ইদ্দত গণনা করো। আর তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে তাদের ঘর থেকে বহিষ্কার করো না এবং তারাও যেন বের না হয়।"
৪. বিচ্ছেদের পর নারীর অধিকার (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৪১)
তালাকপ্রাপ্ত নারীর ভরণপোষণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَلِلتَّطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ ۖ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ
অর্থ: "আর তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী খরচ প্রদান করা মুত্তাকীদের (আল্লাহভীরুদের) জন্য কর্তব্য।"
৫. ইদ্দতকালীন পবিত্রতা (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৮)
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ
অর্থ: "আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন ঋতু পর্যন্ত নিজেদেরকে প্রতীক্ষায় রাখবে (ইদ্দত পালন করবে)।
সারসংক্ষেপ:
কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, তালাক হলো সম্পর্কের সর্বশেষ ধাপ। আল্লাহ বিচ্ছেদকে বৈধ করেছেন ঠিকই, কিন্তু এর আগে সমঝোতার চেষ্টা করা এবং বিচ্ছেদ হলেও নারীর মোহরানা পরিশোধ করা ও তার সাথে সুন্দর আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামি পারিবারিক আইনে ইদ্দত এবং মোহরানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়। তালাক বা বিচ্ছেদের পর নারীর অধিকার সুরক্ষায় কুরআন এই দুটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে।
নিচে এ সম্পর্কিত আরও কিছু বিস্তারিত আয়াত ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. ইদ্দত (প্রতীক্ষা কাল) সংক্রান্ত বিস্তারিত
ইদ্দত হলো বিচ্ছেদের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নারীর অপেক্ষা করা, যাতে গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়া যায় এবং পুনরায় বিয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়া যায়।
গর্ভবতী নারীর ইদ্দত (সূরা আত-তালাক, আয়াত ৪):
وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
অর্থ: "আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল তাদের সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত।"
বয়স্ক বা শারীরিক কারণে ঋতু বন্ধ হওয়া নারীদের ইদ্দত (সূরা আত-তালাক, আয়াত ৪):
যাদের ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বা এখনো শুরু হয়নি, তাদের জন্য ইদ্দত হলো তিন মাস।
স্বামী মারা গেলে ইদ্দত (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৩৪):
যদি স্বামীর মৃত্যু হয়, তবে স্ত্রীর ইদ্দত হবে চার মাস দশ দিন।
২. মোহরানা ও আর্থিক অধিকার
বিচ্ছেদের সময় মোহরানা বা সম্পদ ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কুরআন অত্যন্ত কঠোর এবং পুরুষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা নারীর প্রতি উদার থাকে।
মোহরানা ফেরত না নেওয়ার নির্দেশ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ২০):
وَإِنْ أَرَدتُّمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَّكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا
অর্থ: "যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও এবং তাদের একজনকে স্তূপীকৃত সম্পদ (মোহরানা হিসেবে) দিয়ে থাকো, তবে তা থেকে কিছুই ফেরত নিও না।"
মোহরানা নির্ধারণের আগে তালাক হলে (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৩৬)
যদি শারীরিক সম্পর্কের আগে এবং মোহরানা নির্ধারিত হওয়ার আগেই তালাক হয়, তবে সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে কিছু উপহার (মুতা’হ) দেওয়া বাধ্যতামূলক।
অর্ধেক মোহরানা প্রদানের নিয়ম (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৩৭):
যদি মোহরানা নির্ধারিত থাকে কিন্তু মিলনের আগেই তালাক হয়, তবে স্ত্রীকে নির্ধারিত মোহরানার অর্ধেক প্রদান করতে হবে, যদি না স্ত্রী তা ক্ষমা করে দেয়।
৩. ইদ্দতকালীন আবাসন ও ভরণপোষণ
তালাক দেওয়ার পর ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنتُم مِّن وُجْدِكُمْ وَلَا تُضَارُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ
অর্থ: "তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে বসবাস করো, তাদেরও (তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী) সেখানে বসবাসের স্থান দাও। আর সংকটে ফেলার উদ্দেশ্যে তাদের কষ্ট দিও না।" (সূরা আত-তালাক, আয়াত ৬)
সারকথা:
কুরআনের এই বিধানগুলো মূলত নারীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। ইসলামে বিচ্ছেদকে নিরুৎসাহিত করা হলেও, একান্ত প্রয়োজনে বিচ্ছেদ ঘটলে যেন তা অত্যন্ত সুন্দর ও মানবিক উপায়ে সম্পন্ন হয়, এটাই আল্লাহর নির্দেশ।
১. মোহরানা নির্ধারণের নিয়ম (Rules of Mahr)
মোহরানা হলো বিবাহের সময় স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে দেওয়া একটি বাধ্যতামূলক উপহার বা আর্থিক নিরাপত্তা। এটি কোনো দয়া নয়, বরং নারীর অধিকার।
নির্ধারণের সময়: মোহরানা বিয়ের সময়ই নির্ধারণ করা উত্তম। তবে বিয়ের পর পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেও এটি নির্ধারণ বা পরিবর্তন (বৃদ্ধি) করা যেতে পারে।
পরিমাণ: মোহরানার কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা নেই। তবে এটি স্বামীর সামর্থ্য এবং স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া উচিত। কুরআন ও হাদিসে মোহরানাকে সহজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন বিয়ে কঠিন না হয়।
পরিশোধের ধরণ:
মুয়াজ্জাল (Prompt): যা বিয়ের পরপরই বা স্ত্রী চাওবামাত্র পরিশোধ করতে হয়।
মুঅজ্জাল (Deferred): যা পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বা বিচ্ছেদ পর্যন্ত সময় নেওয়া হয়।
কুরআনের নির্দেশ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪):
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
অর্থ: "আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহরানা সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।"
২. খুলা তালাক (Khula - বিচ্ছেদে
স্ত্রীর অধিকার)
যদি স্ত্রী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণে স্বামীর সাথে সংসার করতে অপছন্দ করেন বা অসমর্থ হন, তবে তিনি 'খুলা'র মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন।
প্রক্রিয়া: স্ত্রী স্বামীর কাছে বিচ্ছেদের প্রস্তাব দেবেন। এক্ষেত্রে সাধারণত স্ত্রী তার মোহরানা বা মোহরানার কিছু অংশ মওকুফ করে বা ফেরত দিয়ে চুক্তিতে আসেন।
কুরআনের দলিল (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৯):
فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ
অর্থ: "যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা উভয়ে আল্লাহর সীমা রক্ষা করে চলতে পারবে না, তবে স্ত্রী যা দিয়ে (বিনিময়ে) মুক্তি পেতে চায়, তাতে তাদের উভয়ের কোনো গুনাহ নেই।"
শর্তাবলী: খুলা তালাকের জন্য স্বামীর সম্মতি বা আদালতের ডিক্রির প্রয়োজন হয়। এটি কার্যকর হলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, তবে এক্ষেত্রে স্ত্রী কেবল এক মাস (এক ঋতু) ইদ্দত পালন করেন (অধিকাংশ আলেমের মতে), যাতে গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়া যায়।
৩. খুলা ও সাধারণ তালাকের পার্থক্য
|
বিষয় |
সাধারণ তালাক (স্বামী কর্তৃক) |
খুলা তালাক (স্ত্রী কর্তৃক) |
|
উদ্যোগ |
স্বামী গ্রহণ করেন। |
স্ত্রী গ্রহণ করেন। |
|
মোহরানা |
স্বামী সম্পূর্ণ মোহরানা দিতে বাধ্য। |
স্ত্রী সাধারণত মোহরানা ত্যাগ বা ফেরত দেন। |
|
ইদ্দত |
সাধারণত ৩ ঋতু বা ৩ মাস। |
সাধারণত ১ ঋতু (মতভেদে ৩ মাস)। |
একটি জরুরি বিষয়:
ইসলামে বিচ্ছেদকে একটি 'অপ্রীতিকর বৈধ' কাজ হিসেবে দেখা হয়। খুলা হোক বা সাধারণ তালাক—উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অন্তত দুইজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে মিমাংসার চেষ্টা করা কুরআনের নির্দেশ।তফসীর বা অর্থ প্রকাশে যদি কোনো ভ্রান্তি থাকে জানান আমার আগ্রহ জানার। ভালো লাগলে অবশ্য আমাকে ফ্লো করুন। লাইক-শেয়ার-কমেন্ট করুন পড়ার জন্য ধন্যবাদ। নিজে জানুন আমল করুন ও অপর কে শেয়ার করে জানানোর ব্যবস্থা করলে সাওয়াবের কাজ। আল্লাহ হাফিজ।। আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐পাঁশকুড়া।। মুসলিম সমাজের সমস্যা ও সমাধানে আল্লাহর বিধান প্রতি দিন 10 টি পোস্ট রমজান মাসের এই কটি দিন সবাই মিলে আমল করার চেষ্টা করি।। আল্লাহ আমাদের কে ইসলামের বিধানের মধ্যে কার্যকর থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন❤
📌 Click Icon সাবস্ক্রাইব করুন:

No comments:
Post a Comment