Latest News

মহাভারতের বনপর্ব জটাসুর বধ: দ্রৌপদী ও পাণ্ডবদের অপহরণের চেষ্টাকালে ভীম কর্তৃক জটাসুর নামক রাক্ষস বধ



 মহাভারতের বনপর্ব  জটাসুর বধ: দ্রৌপদী ও পাণ্ডবদের অপহরণের চেষ্টাকালে ভীম কর্তৃক জটাসুর নামক রাক্ষস বধ


মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত জটাসুর বধ কাহিনীটি পাণ্ডবদের বনবাস জীবনের একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর অধ্যায় এই ঘটনায় ভীমের অসীম বীরত্ব এবং পাণ্ডবদের প্রতি তাঁর রক্ষাকর্তা রূপটি আবারও ফুটে ওঠে

ঘটনাটি সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো:

. জটাসুরের ছদ্মবেশ

পাণ্ডবরা যখন বদরিকাশ্রমে অবস্থান করছিলেন, তখন জটাসুর নামক এক রাক্ষস তাঁদের বধ করার দ্রৌপদীকে হরণ করার পরিকল্পনা করে সে একজন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে পাণ্ডবদের আশ্রমে প্রবেশ করে এবং তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করে দীর্ঘকাল তাঁদের সাথেই বসবাস করতে থাকে তার মূল লক্ষ্য ছিল পাণ্ডবদের অস্ত্রশস্ত্র চুরি করা এবং সুযোগ বুঝে তাঁদের আক্রমণ করা

. অপহরণের চেষ্টা

একদিন যখন ভীম শিকারের উদ্দেশ্যে আশ্রমের বাইরে যান, তখন জটাসুর তার আসল রূপ ধারণ করে সে যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব এবং দ্রৌপদীকে তুলে নিয়ে দ্রুতবেগে পালাতে শুরু করে একইসাথে সে পাণ্ডবদের দৈব অস্ত্রগুলোও সঙ্গে নিয়ে নেয়

. যুধিষ্ঠিরের কৌশল

অপহরণের সময় যুধিষ্ঠির বিচলিত না হয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন তিনি জটাসুরকে কথার জালে আটকে তার গতি ধীর করে দেন এবং তাকে বোঝাতে থাকেন যে এই পাপের ফল তাকে ভোগ করতে হবে যুধিষ্ঠির নিজের শরীরের ভার এতটাই বাড়িয়ে দেন যে রাক্ষসটি দ্রুত হাঁটতে পারছিল না

. ভীমের আগমন যুদ্ধ

দ্রৌপদী ভাইদের বিপদের কথা জানতে পেরে ভীম দ্রুত সেখানে উপস্থিত হন ভীমকে দেখে জটাসুর অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়ে এরপর শুরু হয় দুই মহাবীর রাক্ষসের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ

মল্লযুদ্ধ: তারা একে অপরের দিকে বিশাল বিশাল গাছ এবং পাথর ছুঁড়তে থাকেন

চূড়ান্ত আঘাত: শেষ পর্যন্ত ভীম জটাসুরকে জাপটে ধরেন এবং প্রচণ্ড এক ঘুষিতে তার মস্তক চূর্ণ করে দেন


সারসংক্ষেপ: জটাসুর বধের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, পাণ্ডবরা বিপদে পড়লেও তাঁদের বীরত্ব ধর্মবোধ তাঁদের রক্ষা করে ভীমের শারীরিক শক্তি এবং যুধিষ্ঠিরের ধৈর্যএই দুইয়ের সংমিশ্রণেই জটাসুরের পতন ঘটে

 

 

মহাভারতের বনপর্ব অত্যন্ত বিশাল এবং এখানে পাণ্ডবদের ১২ বছরের বনবাস জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় কাহিনী রয়েছে আপনি যদি চান, তবে আমি নিচের যেকোনো একটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারি:

যক্ষ-যুধিষ্ঠির সংবাদ: যেখানে বকরূপী ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে জীবনের গূঢ় রহস্য নিয়ে জটিল সব প্রশ্ন করেছিলেন

 

মহাভারতের বনপর্বের অন্যতম দার্শনিক জ্ঞানগর্ভ অংশ হলো যক্ষ-যুধিষ্ঠির সংবাদ এটি কেবল একটি প্রশ্ন-উত্তরের সংকলন নয়, বরং জীবন, ধর্ম এবং নৈতিকতার এক গভীর বিশ্লেষণ

প্রেক্ষাপট: তৃষ্ণার্ত পাণ্ডব বক-রূপী যক্ষ

বনবাসকালে একদিন পাণ্ডবরা অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন যুধিষ্ঠিরের আদেশে নকুল জল খুঁজতে গিয়ে একটি সুন্দর সরোবর দেখতে পান জল পান করতে গেলেই এক অদৃশ্য কণ্ঠ (বক-রূপী যক্ষ) তাঁকে বাধা দেয় এবং জানায় যে, আগে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, তারপর জল পান করা যাবে

নকুল তৃষ্ণার তাড়নায় সেই সতর্কবাণী উপেক্ষা করে জল পান করেন এবং অচেতন হয়ে পড়ে যান এরপর সহদেব, অর্জুন এবং ভীম একে একে সেখানে যান এবং একই পরিণতি বরণ করেন শেষে যুধিষ্ঠির সেখানে পৌঁছে তাঁর ভাইদের মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি ধৈর্য ধরে যক্ষের প্রশ্নের উত্তর দিতে সম্মত হন


গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন উত্তর (নির্বাচিত)

যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে প্রায় ১০০টিরও বেশি প্রশ্ন করেছিলেন তার মধ্যে কয়েকটি অত্যন্ত বিখ্যাত:

যক্ষের প্রশ্ন

যুধিষ্ঠিরের উত্তর

পৃথিবীর চেয়ে ভারী কী?

মাতা পৃথিবীর চেয়েও অধিক গুরুভার বা শ্রেষ্ঠ

আকাশের চেয়েও উচ্চ কে?

পিতা আকাশের চেয়েও উচ্চ

বায়ুর চেয়েও দ্রুতগামী কী?

মানুষের 'মন' বায়ুর চেয়েও দ্রুত চলে

তৃণের চেয়েও সংখ্যায় বেশি কী?

মানুষের অন্তরের 'চিন্তা' বা দুশ্চিন্তা

বিদেশে কার বন্ধু কে?

বিদেশে মানুষের জ্ঞান বা বিদ্যাই শ্রেষ্ঠ বন্ধু

সুখ কী?

যে ব্যক্তি ঋণী নয় এবং যার শীল বা চরিত্র ভালো, সেই প্রকৃত সুখী

সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় (মহদাশ্চর্য) কী?

প্রতিদিন অগণিত প্রাণী যমালয়ে (মৃত্যুর পথে) যাচ্ছে, তা দেখেও বাকিরা মনে করে তারা চিরকাল বেঁচে থাকবেএর চেয়ে আশ্চর্য আর কিছু নেই

প্রকৃত পথ (ধর্মের পথ) কোনটি?

মহাজন বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা যে পথে চলেন, সেটিই প্রকৃত পথ


ফলাফল ভ্রাতৃপ্রেম

যুধিষ্ঠিরের পাণ্ডিত্যে সন্তুষ্ট হয়ে যক্ষ বলেন, "আমি তোমার যেকোনো একজন ভাইকে জীবিত করে দেব" যুধিষ্ঠির তখন তাঁর বিমাতা মাদ্রী- পুত্র নকুলকে জীবিত করার অনুরোধ করেন

যক্ষ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, "ভীম বা অর্জুন থাকতে তুমি কেন নকুলকে বেছে নিলে?" যুধিষ্ঠির শান্তভাবে উত্তর দেন:

"আমার পিতা কুন্তীর পুত্র হিসেবে আমি জীবিত আছি, তাই বিমাতা মাদ্রী যেন সম্পূর্ণ পুত্রহীন না হন, সেই ধর্ম রক্ষার জন্যই আমি নকুলকে চেয়েছি"

যুধিষ্ঠিরের এই অসামান্য ন্যায়নিষ্ঠা পক্ষপাতহীনতায় মুগ্ধ হয়ে যক্ষ (যিনি আসলে স্বয়ং ধর্মরাজ) তাঁর চার ভাইকেই জীবিত করে দেন এবং পাণ্ডবদের বর দেন যে, তাঁদের অজ্ঞাতবাস কেউ ধরতে পারবে না

কিরাত-অর্জুন যুদ্ধ: যেখানে মহাদেব শিবের সাথে অর্জুনের যুদ্ধ হয় এবং অর্জুন 'পাশুপত' অস্ত্র লাভ করেন

 

মহাভারতের বনপর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বীরত্বগাথা হলো কিরাত-অর্জুন যুদ্ধ এটি অর্জুনের তপস্যা, সাহসিকতা এবং পরমেশ্বর শিবের কাছ থেকে আশীর্বাদ প্রাপ্তির এক অনন্য কাহিনী

. প্রেক্ষাপট: দিব্যাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা

বনবাসকালে মহর্ষি ব্যাসদেব পাণ্ডবদের পরামর্শ দেন যে, ভবিষ্যতে কৌরবদের সাথে যুদ্ধে জয়ী হতে হলে তাঁদের শক্তিশালী দিব্যাস্ত্র প্রয়োজন বিশেষ করে অর্জুনকে তিনি পরামর্শ দেন মহাদেব শিবের আরাধনা করে তাঁর কাছ থেকে অজেয় 'পাশুপত' অস্ত্র লাভ করার জন্য ব্যাসদেবের নির্দেশে অর্জুন হিমালয়ের ইন্দ্রকীল পর্বতে কঠোর তপস্যা শুরু করেন

. অর্জুনের কঠোর তপস্যা মুক দানব

অর্জুনের তপস্যার তেজে চারপাশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে দেবতারা ভীত হয়ে শিবের শরণাপন্ন হন এদিকে, দুর্যোধনের পাঠানো মুক নামক এক রাক্ষস বন্য বরাহ (শুয়োর) রূপ ধরে অর্জুনকে আক্রমণ করতে আসে

অর্জুন যখন সেই বরাহকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই এক ব্যাধ (কিরাত) বেশধারী পুরুষও সেখানে উপস্থিত হন এবং একই সাথে তীর ছোড়েন দুই তীরের আঘাতেই রাক্ষসটি মারা যায়

. কিরাত অর্জুনের যুদ্ধ

কে বরাহটিকে আগে মেরেছে, তা নিয়ে ছদ্মবেশী শিব (কিরাত) এবং অর্জুনের মধ্যে বিবাদ শুরু হয় অর্জুন কিরাতকে সাধারণ মানুষ মনে করে তুচ্ছজ্ঞান করেন, কিন্তু যুদ্ধে তিনি অবাক হয়ে দেখেন:

অর্জুনের কোনো অস্ত্রই কিরাতের গায়ে আঁচড় কাটতে পারছে না

অর্জুনের অক্ষয় তূণীরের সমস্ত তীর শেষ হয়ে যায়

শেষে অর্জুন তাঁর প্রিয় ধনুক গাণ্ডীব দিয়ে কিরাতকে আঘাত করার চেষ্টা করলে কিরাত অবলীলায় সেই ধনুকটিও কেড়ে নেন

অর্জুন তখন বুঝতে পারেন এই কিরাত কোনো সাধারণ মানুষ নন তিনি নিরুপায় হয়ে মাটির একটি শিবলিঙ্গ তৈরি করে তাতে পূজা দেন এবং সেই পুষ্পমাল্য অলৌকিকভাবে কিরাতের মাথায় দেখতে পান

. মহাদেবের আত্মপ্রকাশ পাশুপত অস্ত্র দান

অর্জুন বুঝতে পারেন এই কিরাত স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব তিনি শিবের চরণে লুটিয়ে পড়েন শিব তাঁর বীরত্ব একাগ্রতায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং নিজের আসল রূপে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি অর্জুনকে বর হিসেবে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র 'পাশুপত' প্রদান করেন

শিক্ষা: এই যুদ্ধটি ছিল অর্জুনের অহংকার বিনাশ এবং তাঁর ধৈর্যের পরীক্ষা মহাদেব দেখতে চেয়েছিলেন অর্জুন তাঁর শক্তির গর্ব করেন নাকি ধর্মের প্রতি অনুগত থাকেন


. পরবর্তী ধাপ: ইন্দ্রলোক গমন

শিবের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পর যমরাজ, বরুণ এবং কুবেরের মতো দিকপাল দেবতারাও অর্জুনকে তাঁদের দিব্যাস্ত্র দান করেন এরপর দেবরাজ ইন্দ্রের সারথি মাতলি অর্জুনকে রথে করে ইন্দ্রলোকে (স্বর্গ) নিয়ে যান, যেখানে তিনি দীর্ঘ বছর থেকে যুদ্ধবিদ্যা আরও ঝালিয়ে নেন

 

নল-দময়ন্তীর উপাখ্যান: ঋষি বৃহদশ্ব যুধিষ্ঠিরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এই বিরহ পুনর্মিলনের কাহিনী শুনিয়েছিলেন

 

মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত নল-দময়ন্তীর উপাখ্যান একটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং ধৈর্য পরীক্ষার কাহিনী যখন পাণ্ডবরা বনবাসে দুঃখে ভেঙে পড়ছিলেন, তখন মহর্ষি বৃহদশ্ব যুধিষ্ঠিরকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে এই গল্পটি শোনান তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, যুধিষ্ঠিরের চেয়েও বেশি কষ্ট সহ্য করে রাজা নল শেষ পর্যন্ত নিজের রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন

. হংসের মাধ্যমে প্রণয় স্বয়ম্বর

নিষদ দেশের রাজা নল ছিলেন অত্যন্ত রূপবান এবং অশ্ববিদ্যায় পারদর্শী অন্যদিকে বিদর্ভরাজ ভীমের কন্যা দময়ন্তী ছিলেন অসামান্য সুন্দরী এক রাজহংসের মাধ্যমে তাঁরা একে অপরের গুণের কথা জানতে পারেন এবং অনুরাগে আবদ্ধ হন

দময়ন্তীর স্বয়ম্বর সভায় দেবতারাও (ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, যম) উপস্থিত হন তাঁরা নলের রূপ ধরে সারিবদ্ধভাবে বসেন কিন্তু দময়ন্তী তাঁর প্রখর বুদ্ধি ভক্তি দিয়ে দেবতাদের চিনে নেন এবং প্রকৃত মানুষেরূপী নলের গলায় বরমাল্য প্রদান করেন

. কলির প্রভাব রাজ্য হারানো

নল দময়ন্তীর এই সুখে দেবতারা সন্তুষ্ট হলেও কলি (কলিযুগের অধিষ্ঠাতা) অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন তিনি সুযোগ খুঁজতে থাকেন কীভাবে নলের ক্ষতি করা যায় একদিন নল ঠিকমতো শৌচকার্য না সেরে উপাসনায় বসলে কলি তাঁর শরীরে প্রবেশ করেন

কলির প্রভাবে নল তাঁর ভাই পুষ্করের সাথে পাশা খেলায় মত্ত হন এবং নিজের সমস্ত রাজ্য ধনসম্পদ হারিয়ে ফেলেন এরপর শুরু হয় তাঁদের চরম কষ্টের বনবাস জীবন

. বিচ্ছেদ কর্কোটক নাগ

বনে ক্ষুধার্ত বস্ত্রহীন অবস্থায় নল ভাবলেন, দময়ন্তী তাঁর সাথে থাকলে আরও কষ্ট পাবেন তাই কলির মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে তিনি ঘুমন্ত দময়ন্তীকে একা ফেলে রেখে চলে যান

পথে নল কর্কোটক নামক এক নাগকে আগুন থেকে রক্ষা করেন প্রতিদানে নাগটি নলকে দংশন করে তাঁর রূপ বিকৃত করে দেয় (যাতে কেউ তাঁকে চিনতে না পারে) এবং পরামর্শ দেয় যে, এই রূপই তাঁকে ভবিষ্যতে রক্ষা করবে নল নিজের নাম বদলে 'বাহুক' রেখে অযোধ্যার রাজা ঋতুপর্ণের সারথি হিসেবে কাজ শুরু করেন

. দময়ন্তীর পতিভক্তি পুনর্মিলন

এদিকে দময়ন্তী জেগে উঠে পাগলিনীর মতো নলকে খুঁজতে থাকেন অনেক কষ্টের পর তিনি চেদী দেশে এবং পরে তাঁর বাবার রাজ্যে পৌঁছান তিনি বুঝতে পারেন 'বাহুক' নামক সারথিই আসলে তাঁর স্বামী নল হতে পারেন, কারণ নলের মতো অশ্ববিদ্যা আর কারো ছিল না

দময়ন্তী একটি কৌশলী 'দ্বিতীয় স্বয়ম্বর'-এর আয়োজন করেন রাজা ঋতুপর্ণের সাথে বাহুক (নল) সেখানে পৌঁছান দময়ন্তী তাঁর সন্তানদের পাঠিয়ে এবং নলের হাতের রান্নার স্বাদ নিয়ে তাঁকে চিনে ফেলেন নলের রূপও কর্কোটক নাগের দেওয়া বস্ত্র পরিধানের ফলে আগের মতো সুন্দর হয়ে যায়

. রাজ্য পুনরুদ্ধার

নল এরপর রাজা ঋতুপর্ণের কাছ থেকে 'অক্ষবিদ্যা' (পাশা খেলার কৌশল) শিখে নেন এবং পুনরায় পুষ্করকে পাশা খেলায় পরাজিত করে নিজের রাজ্য ফিরে পান কলি তাঁর শরীর থেকে চিরতরে মুক্তি পায়


শিক্ষণীয়: এই কাহিনীটি আমাদের শেখায় যে, ভাগ্যের ফেরে মানুষ সব হারালেও ধৈর্য, সত্যনিষ্ঠা এবং দাম্পত্য প্রেম থাকলে হারানো গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব

সাবিত্রী-সত্যবানের কাহিনী: যমরাজের কাছ থেকে সাবিত্রীর পতিকে ফিরিয়ে আনার সেই বিখ্যাত গল্প

মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত সাবিত্রী-সত্যবানের কাহিনী হলো ভারতীয় সংস্কৃতির সতীত্ব, বুদ্ধিমত্তা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য প্রতীক যখন পাণ্ডবরা বনবাসে দ্রৌপদীর দুঃখ দেখে বিচলিত হচ্ছিলেন, তখন ঋষি মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে এই কাহিনী শুনিয়েছিলেন এটি বোঝাতে যে, একজন নারীর সংকল্প মৃত্যুকেও জয় করতে পারে

. সাবিত্রীর পতি নির্বাচন

মদ্ররাজ অশ্বপতির কন্যা সাবিত্রী ছিলেন অত্যন্ত গুণবতী তেজস্বিনী তিনি নিজের পতি হিসেবে বেছে নেন সত্যবানকে, যিনি ছিলেন রাজ্যচ্যুত অন্ধ রাজা দ্যুমৎসেনের পুত্র সত্যবান তখন তাঁর বাবা-মায়ের সাথে তপোবনে ঋষির মতো জীবনযাপন করতেন

দেবর্ষি নারদ সাবিত্রীকে সতর্ক করে বলেন যে, সত্যবান সর্বগুণসম্পন্ন হলেও তাঁর আয়ু আর মাত্র এক বছর বাকি কিন্তু সাবিত্রী তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং সত্যবানকেই বিবাহ করেন

. সেই নির্ধারিত দিন যমরাজের আগমন

বিয়ের পর সাবিত্রী রাজপ্রাসাদের সুখ ত্যাগ করে তপোবনে স্বামীর সেবা কঠোর ব্রত পালনে মগ্ন হন নারদ মুনি যে দিনটির কথা বলেছিলেন, সেই দিনটি ঘনিয়ে এলে সাবিত্রী সত্যবানের সাথে বনে যান কাঠ কাটার সময় হঠাৎ সত্যবানের মাথা ঘোরে এবং তিনি সাবিত্রীর কোলে মাথা রেখে অচেতন হয়ে পড়েন

তখন সেখানে স্বয়ং যমরাজ উপস্থিত হন সত্যবানের প্রাণ হরণ করতে যমরাজ সত্যবানের প্রাণ নিয়ে দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করলে সাবিত্রীও তাঁর পিছু পিছু চলতে থাকেন

. যমরাজের সাথে সাবিত্রীর কথোপকথন

যমরাজ সাবিত্রীকে বারবার ফিরে যেতে বলেন, কিন্তু সাবিত্রী তাঁর বুদ্ধিমত্তা এবং ধর্মজ্ঞানের কথা দিয়ে যমরাজকে মুগ্ধ করেন সাবিত্রীর নিষ্ঠা দেখে যমরাজ তাঁকে সত্যবানের প্রাণ ছাড়া অন্য যেকোনো তিনটি বর চাইতে বলেন:

প্রথম বর: সাবিত্রী তাঁর শ্বশুর (অন্ধ রাজা দ্যুমৎসেন)-এর দৃষ্টিশক্তি এবং হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার বর চাইলেন (যমরাজ তা মঞ্জুর করলেন)

দ্বিতীয় বর: নিজের পিতা অশ্বপতির যাতে একশোটি পুত্র সন্তান হয়, সেই বর চাইলেন (যমরাজ এটিও মঞ্জুর করলেন)

তৃতীয় বর (কৌশলী বর): এবার সাবিত্রী চাইলেন যে, তিনি যেন সত্যবানের ওরসে একশোটি পুত্র সন্তানের জননী হতে পারেন

. যমরাজের হার সত্যবানের পুনর্জীবন

যমরাজ যখন সাবিত্রীর তৃতীয় বরটি মঞ্জুর করলেন, তখন তিনি এক ধর্মসঙ্কটে পড়ে গেলেন কারণ, সত্যবানের প্রাণ ছাড়া সাবিত্রীর পক্ষে মা হওয়া সম্ভব ছিল না সাবিত্রী বিনীতভাবে মনে করিয়ে দেন যে, যমরাজের বর সত্য করতে হলে সত্যবানকে জীবিত করতেই হবে

যমরাজ সাবিত্রীর এই প্রখর বুদ্ধি এবং অটল পতিভক্তি দেখে অত্যন্ত প্রসন্ন হন এবং সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে দেন সত্যবান পুনরায় জীবিত হয়ে ওঠেন এবং তাঁরা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকেন


মূল শিক্ষা: সাবিত্রী কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করেননি; তিনি তাঁর জ্ঞান, ধৈর্য এবং কৌশলী বুদ্ধির মাধ্যমে স্বয়ং মৃত্যুপতিকে পরাজিত করেছিলেন

দুরাত্মা জয়দ্রথ কর্তৃক দ্রৌপদী হরণ: এবং পরবর্তীতে ভীম অর্জুনের হাতে তার চরম লাঞ্ছনা

 

মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত জয়দ্রথ কর্তৃক দ্রৌপদী হরণ পাণ্ডবদের বনবাস জীবনের একটি অত্যন্ত অপমানজনক উত্তেজনাকর ঘটনা এটি সিন্ধুরাজ জয়দ্রথের পতন এবং পাণ্ডবদের বীরত্বের এক জলন্ত দৃষ্টান্ত

ঘটনাটি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

. জয়দ্রথের কুদৃষ্টি

একদিন পাণ্ডবরা আশ্রমে দ্রৌপদীকে একা রেখে শিকারের উদ্দেশ্যে বনে যান সেই সময় সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ (যিনি ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা এবং দুঃশলার স্বামী) সসৈন্যে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন আশ্রমের দ্বারে দ্রৌপদীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি তাঁর সৌন্দর্যে মোহিত হন এবং তাঁকে হরণ করার কুমতলব আঁটেন

. অপহরণের অপচেষ্টা

জয়দ্রথ প্রথমে তাঁর এক অনুচরকে পাঠিয়ে দ্রৌপদীর পরিচয় জানতে চান পরে তিনি নিজে আশ্রমে এসে দ্রৌপদীকে তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করেন দ্রৌপদী তাঁকে পতিব্রতা ধর্মের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কঠোরভাবে তিরস্কার করেন কিন্তু পাপিষ্ঠ জয়দ্রথ কোনো কথা না শুনে বলপূর্বক দ্রৌপদীকে তাঁর রথে তুলে নিয়ে পালিয়ে যান

. পাণ্ডবদের প্রতাবর্তন ধাওয়া

পাণ্ডবরা আশ্রমে ফিরে ধাত্রী ঋষিদের কাছে সমস্ত ঘটনা জানতে পারেন ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ভীম অর্জুন দ্রুত জয়দ্রথের রথের পিছু নেন যুধিষ্ঠিরও তাঁদের সাথে যোগ দেন অর্জুনের তীরের আঘাতে জয়দ্রথের সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং ভীম জয়দ্রথের রথের কাছে পৌঁছে যান

. জয়দ্রথের লাঞ্ছনা ভীমের দণ্ড

ভয় পেয়ে জয়দ্রথ দ্রৌপদীকে রথ থেকে নামিয়ে দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন কিন্তু ভীম তাঁকে ধরে ফেলেন ভীম তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠির তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে, জয়দ্রথ তাঁদের ভগ্নীপতি (দুঃশলার স্বামী), তাই তাঁকে বধ করা উচিত হবে না

বিচারের পর ভীম জয়দ্রথকে এক চরম অপমানজনক শাস্তি দেন:

তিনি জয়দ্রথের মাথা ন্যাড়া করে দেন, তবে কেবল পাঁচটি গুছি চুল রেখে দেন (যা দাসের প্রতীক)

তাঁকে দিয়ে জনসমক্ষে স্বীকার করানো হয় যে তিনি পাণ্ডবদের দাস

. জয়দ্রথের প্রতিশোধ বর লাভ

এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে জয়দ্রথ কঠোর তপস্যা শুরু করেন মহাদেব শিব তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হলে জয়দ্রথ বর চান যে তিনি যেন যুদ্ধে পাণ্ডবদের পরাজিত করতে পারেন শিব বলেন যে তিনি কেবল অর্জুন ছাড়া বাকি চার পাণ্ডবকে একদিনের জন্য যুদ্ধে আটকে রাখতে পারবেন এই বরটিই পরবর্তীকালে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অভিমন্যু বধের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল


শিক্ষণীয়: এই ঘটনাটি দেখায় যে অহংকার এবং পরস্ত্রী হরণ কেবল পতনই ডেকে আনে না, বরং আজীবন কলঙ্ক লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়

 

No comments:

Featured Post

কম্পিউটার সিস্টেম সেটআপ : আলোচনা

কম্পিউটার সিস্টেম ছবিটি একটি আধুনিক কম্পিউটার সিস্টেমের বিভিন্ন অংশ (Parts of a Computer System) নিয়ে একটি চমৎকার তথ্যচিত্র। একট...

Writer Profile

Writer Profile
Click Logo